পরীক্ষা মূলক আপডেট

মুসলিম সভ্যতায় মিনার সংস্কৃতি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেটের সময়: মঙ্গলবার, নভেম্বর ২৪, ২০২০
  • 122 পাঠক
মুসলিম সভ্যতায় মিনার সংস্কৃতি
মুসলিম সভ্যতায় মিনার সংস্কৃতি

মিনার শব্দটি আরবি। তবে মুসলিম দেশগুলোতে ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় এই শব্দ অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। মিনারের শীর্ষভাগ মসজিদের থেকে উঁচু হয়। আজানের আওয়াজ দূরে পৌঁছানোর জন্য মিনারের ব্যবহার হয়। আধুনিক যুগে মাইকের সাহায্যে আজান দেওয়া হয়। এর পরও মসজিদের স্থাপত্যে মিনারের ব্যবহার আছে। মিনারের শীর্ষে মাইক যুক্ত করে শব্দ দূরে পৌঁছানো যায়।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে মদিনায় মিনারের ব্যবহার ছিল না। সে সময় ছাদের ওপর থেকে আজান দেওয়া হতো। রাসুল (সা.)-এর ওফাতের পর মিনারের ব্যবহার শুরু হয়। তিউনিশিয়ার উকবা মসজিদের বড় মিনার পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন টিকে থাকা মিনার। ৮৩৬ সালে এর নির্মাণ সম্পন্ন হয়। বর্তমানে পৃথিবীর সর্বোচ্চ মিনার মরক্কোর কাসাব্লাংকায় দ্বিতীয় হাসান মসজিদে অবস্থিত। এর উচ্চতা ২১০ মিটার (৬৮৯ ফুট)। ইট নির্মিত সর্বোচ্চ মিনার হলো ভারতের দিল্লির কুতুব মিনার।

কিছু পুরনো মসজিদ, যেমন—দামেস্কের উমাইয়া মসজিদের মিনার ওয়াচ টাওয়ার হিসেবেও কাজ করত।

মুসলিম সভ্যতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আব্বাসীয় খিলাফত আমলে মসজিদ স্থাপত্যের সঙ্গে মিনার সংস্কৃতি যুক্ত হয়। এ ক্ষেত্রে ইরাকের সামেরা শহরের মিনারের কথা সুপ্রসিদ্ধ। সে সময় ইবনে তুলুন কায়রোতে তিন স্তরবিশিষ্ট মিনার নির্মাণ করেন। ফাতেমীয় আমলে মিনারের উচ্চতা বাড়তে থাকে। সে আমলে নির্মিত মিসরের জামে আজহারের মিনারের কথা সুবিদিত। মামলুকি শাসনামলে মিনারের উচ্চতা আরো বাড়তে থাকে। যেমন—সুলতান হাসান জামে মসজিদ। মোগল আমলে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে মিনার নির্মাণ শুরু হয়। সে সময়ে হিন্দুস্তানে বেশ কিছু বড় মিনার তৈরি হয়। যেমন—তাজমহল ও দিল্লি জামে মসজিদের মিনার।

উসমানি খিলাফত আমলে মিনারে উচ্চতার পাশাপাশি কারুকাজের প্রচলন ঘটে। যেমন—দামেস্কের সোলাইমানিয়া জামে মসজিদের মিনার। প্রশ্ন হলো, এই মিনার নির্মাণকে ইসলাম কিভাবে দেখে। এই প্রশ্ন ওঠার কারণ হলো, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে এর প্রচলন ছিল না। এই প্রশ্নের জবাব হলো, আরব-অনারবের ইসলামিক স্কলাররা এ বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছেন যে আজান দেওয়ার জন্য মসজিদে উঁচু মিনার তৈরি করা যাবে। কারণ এতে দূরবর্তী লোকদের আজান শোনানো সহজ হয়। আর আজানের স্বর যত উচ্চ হয়, ততই উত্তম। (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৯; ইবনু কুদামা, আল-মুগনি ১/৩০৮)

আর মিনারে চাঁদের প্রতীক স্থাপন নির্ভর করবে কর্তৃপক্ষের নিয়তের ওপর। যদি সেটিকে মসজিদ বোঝানোর জন্য স্থাপন করা হয়, তাহলে জায়েজ। আর অন্য কোনো উদ্দেশ্য থাকলে জায়েজ হবে না। সাধারণভাবে চাঁদ-তারা কোনো ইসলামী নিশানা হওয়ার ব্যাপারে ইসলামী শরিয়তের কোনো দলিল নেই। রাসুল (সা.), সাহাবায়ে কিরাম, এমনকি পরবর্তী যুগেও এর কোনো অস্তিত্ব ছিল না। তবে মধ্যযুগে তুর্কি শাসকরা খ্রিস্টানদের ক্রুশের বিপরীতে ইসলামী নিদর্শন হিসেবে চাঁদ-তারা নির্বাচন করেছিলেন এবং এটি তুর্কি সাম্রাজ্যের প্রতীকে পরিণত হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় আধুনিক যুগে বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্র ও ইসলামী সংস্থাগুলো তাদের পতাকায় ক্রুশের বিপরীতে ইসলামী নিদর্শন হিসেবে চিহ্নটি ব্যবহার করে থাকে। এতে উলামায়ে কিরাম কোনো আপত্তি করেননি। কেননা রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা ইহুদি ও খ্রিস্টানদের বিরোধিতা করো।’ (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস : ২১৮৬)

তবে কতিপয় বিদ্বান কাফিরদের সাদৃশ্য অবলম্বনের সম্ভাবনা থেকে দূরে থাকতে এমন চিহ্ন ব্যবহার না করাই উত্তম বলে মত প্রকাশ করেছেন। (ফাতাওয়া উসাইমিন, মাজমুউল ফাতাওয়া ১৬/১৭৮)

তবে ইসলামের প্রথম যুগে মিনার ছিল না—এ কথা অকাট্যভাবে বলা যাবে না। তবে হ্যাঁ, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে মিনার সংস্কৃতি না থাকলেও সাহাবায়ে কিরামের যুগে সেটি ছিল। এ বিষয়ে মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বা নামক হাদিস গ্রন্থে প্রমাণ পাওয়া যায়। আবদুল্লাহ বিন শাকিক (রহ.) বলেন, সুন্নত হলো, আজান মিনারে হবে এবং ইকামত মসজিদে হবে। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) এভাবেই আমল করতেন (মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বা, হাদিস : ৩৪৫)

অনুরূপভাবে ইমাম আহমদ (রহ.) মুসনাদ আহমাদ নামক গ্রন্থে বিশুদ্ধ সূত্রে আবু হুরায়রা (রা.) থেকে এ বিষয়ে একটি বর্ণনা এনেছেন। বরং এ বিষয়ে কয়েকটি হাদিসের কিতাবে আলাদা অধ্যায় আনা হয়েছে। ইমাম আবু দাউদ (রহ.) সুনানে আবু দাউদে এ বিষয়ে একটি অধ্যায় এনেছেন। এর শিরোনাম হলো, ‘বাবুল আযান ফাওকাল মানারাতি (মিনারের ওপর আজান দেওয়া অধ্যায়)।’ ইমাম বায়হাকি (রহ.) তাঁর গ্রন্থে এ বিষয়ে ‘আল-আযান ফিল মানারাহ’ শিরোনামে একটি অধ্যায় এনেছেন।

মোটকথা হলো, মিনার সংস্কৃতি ইসলামে সুবিদিত একটি বিষয়। এটি মসজিদ স্থাপত্য ও দৃষ্টিনন্দন স্থাপনায় যুগে যুগে ব্যবহৃত হয়েছে। সাহাবায়ে কিরামের যুগ থেকে হাজার বছর ধরে পৃথিবীর বেশির ভাগ মুসলিম দেশে স্থাপত্যশিল্পে মিনার মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

Please Share This Post in Your Social Media

এ বিভাগের আরো খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *