Dhaka 8:41 am, Wednesday, 24 April 2024

বাংলাদেশের ক্রিকেট ঘুরে-ফিরে সেই সাকিব-তামিমের হাতেই

  • Reporter Name
  • Update Time : 03:08:51 am, Tuesday, 19 January 2021
  • 269 Time View

 

সাগর হোসেন : সাকিব আল হাসান।বাংলার নয়, এ বিশ্বের ক্রিকেট আকাশের এক উজ্জল নক্ষত্র। ওয়ানডের এক নম্বর অলরাউন্ডার তিনি। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে আগামীকাল শুরু তিন ওয়ানডের সিরিজে সাকিবই হবেন আরেক নক্ষত্র অধিনায়ক তামিমের সবচেয়ে বড় ভরসা। কাল মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে অনুশীলনের ফাঁকে অনেকটা সময় নিজেদের মধ্যে আলোচনা করলেন তারা দুজন।

মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে শীতের পড়ন্ত বিকেল। ড্রেসিংরুমের সামনে সবুজ ঘাসের ওপর একটু আয়েশি ভঙ্গিতেই মুখোমুখি বসে সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবাল। কখনো তামিম কথা বলছেন, সাকিব শ্রোতা। কখনো কথা বলছেন সাকিব, শ্রোতা তামিম। দূর থেকে আলোচনার বিষয়বস্তু বোঝার উপায় ছিল না। সেটার দরকারও নেই। শুধু এই দৃশ্যটাই তো বাংলাদেশের ক্রিকেটকে দিতে পারে একটা সুখের বার্তা, দেখাতে পারে অনিন্দ্যসুন্দর সম্ভাবনা।

তা ঠিক কত দিন পর এমন একটা ফ্রেম খুঁজে পেলেন ফটো সাংবাদিকেরা? এক বছরের বেশি তো বটেই। বহিষ্কৃত হওয়ার আগে সাকিব শেষ দিকে যে ম্যাচগুলোতে বা অনুশীলনে মাঠে ছিলেন, তখনো কি খুব সহজ ছিল এমন ফ্রেম বের করে আনা? উইকেটে ব্যাটিং করা ছাড়া সাকিব-তামিম এতটা সময় একসঙ্গে কাটিয়েছেনই–বা সর্বশেষ কবে!

কাল বিকেলে যা–ও কাঙ্ক্ষিত ফ্রেমটা পাওয়া গেল, তা–ও সামনে কত বাধা! কখনো দুজনের মাঝে বসে পড়ছেন কোচ রাসেল ডমিঙ্গো, কখনো পাশে এসে দাঁড়াচ্ছেন সাইফউদ্দিন বা আফিফ হোসেন, আবার কখনোবা ক্যামেরার সামনে দেয়াল হচ্ছেন মাঠকর্মীদের কেউ। এটা ঠিক যে সাকিব-তামিমের মাঝে কোচ বা আশপাশে অন্য খেলোয়াড়দের রেখে তোলা ছবিগুলোরও খুব ভালো ক্যাপশন হয়। কিন্তু ফ্রেমে শুধু সাকিব-তামিম থাকা মানেই যে ভিন্ন কিছু! সেই ছবি তো শুধু ছবি নয়, বাংলাদেশের ক্রিকেটের উত্থানের গল্পই বলা হয়ে যায় তাতে।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তামিমের চেয়ে সাকিব ছয় মাসের ‘বড়। সাকিবের অভিষেক ২০০৬ সালের ৬ আগস্ট, তামিমের ২০০৭-এর ৯ ফেব্রুয়ারি। এরপর অতিদ্রুতই তাঁরা হয়ে ওঠেন এ দেশের ক্রিকেটের বড় বিজ্ঞাপন এবং সেটি পারফরম্যান্স দিয়েই।

লড়াই করে সুখ খোঁজার দিন থেকে বাংলাদেশের ক্রিকেটকে নতুন দিনের পথ দেখিয়েছে যে প্রজন্ম, সাকিব-তামিম সেই প্রজন্মের অন্যতম প্রতিনিধি। ‘অন্যতম’ কারণ, এই প্রজন্মের নিউক্লিয়াসই এই দুজন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তামিমের চেয়ে সাকিব ছয় মাসের ‘বড়। সাকিবের অভিষেক ২০০৬ সালের ৬ আগস্ট, তামিমের ২০০৭-এর ৯ ফেব্রুয়ারি। এরপর অতিদ্রুতই তাঁরা হয়ে ওঠেন এ দেশের ক্রিকেটের বড় বিজ্ঞাপন এবং সেটি পারফরম্যান্স দিয়েই। একটা সময় এ রকমও চলে আসে, মাঠে বাংলাদেশ দলের ভালো কিছুর পূর্বশর্তই সাকিব বা তামিমের ভালো কিছু করা। অথবা ব্যাপারটা এমন ছিল, সাকিব-তামিম ভালো খেললেই বাংলাদেশ ভালো খেলে।

দলকে সেই নির্ভরতা দিতে পেরেছিলেন বলেই ২০১০ সালের ৩১ ডিসেম্বর তাঁদের কাঁধে ওঠে বাংলাদেশ দলের দায়িত্ব। সাকিব অধিনায়ক, তামিম সহ-অধিনায়ক। কিন্তু বিসিবির চোখে এ দুজনের ‘ব্যাড বয়’ হতে সময় লাগল এক বছরের কম। বয়স কম ছিল, রাজনীতি-কূটনীতি অত বুঝতেন না। দুজনই অনেক অপ্রিয় কথা বলে ফেলতেন বোর্ড কর্তাদের মুখের ওপর। এসবের সঙ্গে যোগ হলো ২০১১ সালের জুলাই-আগস্টে জিম্বাবুয়ে সফরের ব্যর্থতা। সে বছরের ৫ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে বড় দুটি ঘটনা ঘটল। এক. লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা দল ঢাকায় এল। দুই. বাংলাদেশ দলের নেতৃত্ব হারালেন সাকিব ও তামিম।

তত দিনে এ দেশের ক্রিকেটে একটা কথা বেশ জনপ্রিয় হয়ে গেছে। কথাটা হলো, সাকিব-তামিম খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু। দুজনের অভিষেক কাছাকাছি সময়ে। তাঁদের যুগলবন্দী নৈপুণ্য বাংলাদেশকে সাফল্য দেখায়। দুজন একসঙ্গে নেতৃত্বে আসেন এবং একই সঙ্গে নেতৃত্ব হারান। সব মিলিয়ে যেন মুদ্রার এপিঠ–ওপিঠ। সাকিব বললেই তামিমের নাম আসে, তামিম বললেই সাকিবের নাম আসে। বাংলাদেশের ক্রিকেটে নায়ক আর পার্শ্বনায়কের চরিত্রে তাঁরাই থাকতে লাগলেন, নামটাই শুধু হয় অদল-বদল। সতীর্থ যেহেতু, মাঠ…ড্রেসিংরুম…টিম বাস…হোটেল—সবখানেই একসঙ্গে থাকা, বন্ধুত্ব তো হয়ে যায়ই একসময়। সাকিব-তামিমের মধ্যে সেটিকেই খুব ‘ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বে’ রূপ দিতে বাকি কাজটা করল ভক্ত-দর্শকদের কল্পনা। মানুষ সাফল্য দেখতে, সাফল্যের গল্প শুনতে ভালোবাসে। মূল চরিত্ররা ঘনিষ্ঠ বন্ধু হলেই না সেই গল্পটা জমে!

আবার কাহিনির প্রয়োজনে উল্টোটা ভেবে নিতেও অসুবিধা হয় না। করোনার মধ্যেই একটা ঘটনা মনে করে দেখুন। তামিম যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেশি-বিদেশি ক্রিকেটারদের সঙ্গে কয়েক দিন ধরে জমজমাট ভিডিও আড্ডা চালালেন, তাতে একবারও যোগ দেননি তখন যুক্তরাষ্ট্রে থাকা সাকিব। এ নিয়ে কত কল্পকাহিনি! সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেষ পর্যন্ত কাল্পনিক সমীকরণটা দাঁড়াল এ রকম—সাকিব তামিমকে পছন্দ করেন না বলেই আড্ডায় আসেননি। কেউ ভাবলই না সাকিব মাত্রই তখন দ্বিতীয় সন্তানের বাবা হয়েছেন। তাঁর পারিবারিক ব্যস্ততা থাকতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সময়েরও তো একটা পার্থক্য থেকে যায়।

সাকিব-তামিমের মধ্যে ‘ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব’ আবিষ্কার করা কিংবা দুজনের সম্পর্কে ‘তুষের আগুনে’র উত্তাপ অনুভব করা—দুটোই আসলে কল্পনার বাড়াবাড়ি। বাস্তবে সাকিব-তামিম আগে যেখানে ছিলেন, এখনো সেখানেই আছেন এবং সেটা কাল যেখানে ছিলেন সেখানে। বাংলাদেশ দলের ড্রেসিংরুমের সামনে সবুজ গালিচার আড্ডায়। একে অন্যের খুব ভালো সতীর্থ হয়ে বাংলাদেশ দলের খেলোয়াড় তালিকায়। সেখানে বন্ধুত্ব বা পারস্পরিক পছন্দ-অপছন্দের ব্যাপারটা অন্তত তাঁদের কাছে অত গুরুত্বপূর্ণ নয়। মাঠের বোঝাপড়া ঠিক রেখে দলের জন্য ভালো খেলাটাই সব। মাঠের খেলায় সাকিব-তামিমের বোঝাপড়ার রসায়নে তেজস্ক্রিয়তার বুদ্‌বুদ দেখেছেন, এমন দাবি কিন্তু আজ পর্যন্ত কেউই করেননি।

একসময়ে সাকিবের সহ-অধিনায়ক তামিম এখন নিজেই ওয়ানডে দলের অধিনায়ক। তাঁর কোনো সহ-অধিনায়ক আপাতত নেই, কিন্তু মাঠে দরকার পড়লে যে সবার আগে নেতৃত্বে অভিজ্ঞ সাকিবকে ডেকেই পরামর্শ চাইবেন, সেটি তামিমের নেতৃত্বে ২০ জানুয়ারির প্রথম ওয়ানডের আগেই বলে দেওয়া যায়। তামিম বাংলাদেশ দলের ওয়ানডে অধিনায়ক, কিন্তু সাকিব তো ওয়ানডের বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার! তাঁর মতো একজন দলে থাকলে অধিনায়কের রাতের ঘুম এমনিতেই ভালো হবে। সাকিব যখন অধিনায়ক ছিলেন, তামিমের কাছ থেকে দুটো সাহায্য তিনি পেতেন। একটা তো মাঠের পারফরম্যান্স। আরেকটা হলো মাঠের বাইরে দলটাকে বিনি সুতার মালায় গেঁথে রাখা। তামিম বরাবরই এই কাজটা ভালো পারেন। এখন যেহেতু তিনি নিজেই অধিনায়ক, মালা গাঁথা নিশ্চয়ই আরও ভালো হবে। সাকিবের কাছে চাইবেন শুধু মাঠের পারফরম্যান্স, যেটি দিয়ে তিনি একাই পারেন প্রতিপক্ষের সঙ্গে নিজেদের পার্থক্য গড়ে দিতে।

বাংলাদেশের ক্রিকেটটা তাই ঘুরে-ফিরে সেই সাকিব-তামিমের হাতেই।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

বাংলাদেশের ক্রিকেট ঘুরে-ফিরে সেই সাকিব-তামিমের হাতেই

Update Time : 03:08:51 am, Tuesday, 19 January 2021

 

সাগর হোসেন : সাকিব আল হাসান।বাংলার নয়, এ বিশ্বের ক্রিকেট আকাশের এক উজ্জল নক্ষত্র। ওয়ানডের এক নম্বর অলরাউন্ডার তিনি। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে আগামীকাল শুরু তিন ওয়ানডের সিরিজে সাকিবই হবেন আরেক নক্ষত্র অধিনায়ক তামিমের সবচেয়ে বড় ভরসা। কাল মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে অনুশীলনের ফাঁকে অনেকটা সময় নিজেদের মধ্যে আলোচনা করলেন তারা দুজন।

মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে শীতের পড়ন্ত বিকেল। ড্রেসিংরুমের সামনে সবুজ ঘাসের ওপর একটু আয়েশি ভঙ্গিতেই মুখোমুখি বসে সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবাল। কখনো তামিম কথা বলছেন, সাকিব শ্রোতা। কখনো কথা বলছেন সাকিব, শ্রোতা তামিম। দূর থেকে আলোচনার বিষয়বস্তু বোঝার উপায় ছিল না। সেটার দরকারও নেই। শুধু এই দৃশ্যটাই তো বাংলাদেশের ক্রিকেটকে দিতে পারে একটা সুখের বার্তা, দেখাতে পারে অনিন্দ্যসুন্দর সম্ভাবনা।

তা ঠিক কত দিন পর এমন একটা ফ্রেম খুঁজে পেলেন ফটো সাংবাদিকেরা? এক বছরের বেশি তো বটেই। বহিষ্কৃত হওয়ার আগে সাকিব শেষ দিকে যে ম্যাচগুলোতে বা অনুশীলনে মাঠে ছিলেন, তখনো কি খুব সহজ ছিল এমন ফ্রেম বের করে আনা? উইকেটে ব্যাটিং করা ছাড়া সাকিব-তামিম এতটা সময় একসঙ্গে কাটিয়েছেনই–বা সর্বশেষ কবে!

কাল বিকেলে যা–ও কাঙ্ক্ষিত ফ্রেমটা পাওয়া গেল, তা–ও সামনে কত বাধা! কখনো দুজনের মাঝে বসে পড়ছেন কোচ রাসেল ডমিঙ্গো, কখনো পাশে এসে দাঁড়াচ্ছেন সাইফউদ্দিন বা আফিফ হোসেন, আবার কখনোবা ক্যামেরার সামনে দেয়াল হচ্ছেন মাঠকর্মীদের কেউ। এটা ঠিক যে সাকিব-তামিমের মাঝে কোচ বা আশপাশে অন্য খেলোয়াড়দের রেখে তোলা ছবিগুলোরও খুব ভালো ক্যাপশন হয়। কিন্তু ফ্রেমে শুধু সাকিব-তামিম থাকা মানেই যে ভিন্ন কিছু! সেই ছবি তো শুধু ছবি নয়, বাংলাদেশের ক্রিকেটের উত্থানের গল্পই বলা হয়ে যায় তাতে।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তামিমের চেয়ে সাকিব ছয় মাসের ‘বড়। সাকিবের অভিষেক ২০০৬ সালের ৬ আগস্ট, তামিমের ২০০৭-এর ৯ ফেব্রুয়ারি। এরপর অতিদ্রুতই তাঁরা হয়ে ওঠেন এ দেশের ক্রিকেটের বড় বিজ্ঞাপন এবং সেটি পারফরম্যান্স দিয়েই।

লড়াই করে সুখ খোঁজার দিন থেকে বাংলাদেশের ক্রিকেটকে নতুন দিনের পথ দেখিয়েছে যে প্রজন্ম, সাকিব-তামিম সেই প্রজন্মের অন্যতম প্রতিনিধি। ‘অন্যতম’ কারণ, এই প্রজন্মের নিউক্লিয়াসই এই দুজন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তামিমের চেয়ে সাকিব ছয় মাসের ‘বড়। সাকিবের অভিষেক ২০০৬ সালের ৬ আগস্ট, তামিমের ২০০৭-এর ৯ ফেব্রুয়ারি। এরপর অতিদ্রুতই তাঁরা হয়ে ওঠেন এ দেশের ক্রিকেটের বড় বিজ্ঞাপন এবং সেটি পারফরম্যান্স দিয়েই। একটা সময় এ রকমও চলে আসে, মাঠে বাংলাদেশ দলের ভালো কিছুর পূর্বশর্তই সাকিব বা তামিমের ভালো কিছু করা। অথবা ব্যাপারটা এমন ছিল, সাকিব-তামিম ভালো খেললেই বাংলাদেশ ভালো খেলে।

দলকে সেই নির্ভরতা দিতে পেরেছিলেন বলেই ২০১০ সালের ৩১ ডিসেম্বর তাঁদের কাঁধে ওঠে বাংলাদেশ দলের দায়িত্ব। সাকিব অধিনায়ক, তামিম সহ-অধিনায়ক। কিন্তু বিসিবির চোখে এ দুজনের ‘ব্যাড বয়’ হতে সময় লাগল এক বছরের কম। বয়স কম ছিল, রাজনীতি-কূটনীতি অত বুঝতেন না। দুজনই অনেক অপ্রিয় কথা বলে ফেলতেন বোর্ড কর্তাদের মুখের ওপর। এসবের সঙ্গে যোগ হলো ২০১১ সালের জুলাই-আগস্টে জিম্বাবুয়ে সফরের ব্যর্থতা। সে বছরের ৫ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে বড় দুটি ঘটনা ঘটল। এক. লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা দল ঢাকায় এল। দুই. বাংলাদেশ দলের নেতৃত্ব হারালেন সাকিব ও তামিম।

তত দিনে এ দেশের ক্রিকেটে একটা কথা বেশ জনপ্রিয় হয়ে গেছে। কথাটা হলো, সাকিব-তামিম খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু। দুজনের অভিষেক কাছাকাছি সময়ে। তাঁদের যুগলবন্দী নৈপুণ্য বাংলাদেশকে সাফল্য দেখায়। দুজন একসঙ্গে নেতৃত্বে আসেন এবং একই সঙ্গে নেতৃত্ব হারান। সব মিলিয়ে যেন মুদ্রার এপিঠ–ওপিঠ। সাকিব বললেই তামিমের নাম আসে, তামিম বললেই সাকিবের নাম আসে। বাংলাদেশের ক্রিকেটে নায়ক আর পার্শ্বনায়কের চরিত্রে তাঁরাই থাকতে লাগলেন, নামটাই শুধু হয় অদল-বদল। সতীর্থ যেহেতু, মাঠ…ড্রেসিংরুম…টিম বাস…হোটেল—সবখানেই একসঙ্গে থাকা, বন্ধুত্ব তো হয়ে যায়ই একসময়। সাকিব-তামিমের মধ্যে সেটিকেই খুব ‘ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বে’ রূপ দিতে বাকি কাজটা করল ভক্ত-দর্শকদের কল্পনা। মানুষ সাফল্য দেখতে, সাফল্যের গল্প শুনতে ভালোবাসে। মূল চরিত্ররা ঘনিষ্ঠ বন্ধু হলেই না সেই গল্পটা জমে!

আবার কাহিনির প্রয়োজনে উল্টোটা ভেবে নিতেও অসুবিধা হয় না। করোনার মধ্যেই একটা ঘটনা মনে করে দেখুন। তামিম যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেশি-বিদেশি ক্রিকেটারদের সঙ্গে কয়েক দিন ধরে জমজমাট ভিডিও আড্ডা চালালেন, তাতে একবারও যোগ দেননি তখন যুক্তরাষ্ট্রে থাকা সাকিব। এ নিয়ে কত কল্পকাহিনি! সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেষ পর্যন্ত কাল্পনিক সমীকরণটা দাঁড়াল এ রকম—সাকিব তামিমকে পছন্দ করেন না বলেই আড্ডায় আসেননি। কেউ ভাবলই না সাকিব মাত্রই তখন দ্বিতীয় সন্তানের বাবা হয়েছেন। তাঁর পারিবারিক ব্যস্ততা থাকতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সময়েরও তো একটা পার্থক্য থেকে যায়।

সাকিব-তামিমের মধ্যে ‘ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব’ আবিষ্কার করা কিংবা দুজনের সম্পর্কে ‘তুষের আগুনে’র উত্তাপ অনুভব করা—দুটোই আসলে কল্পনার বাড়াবাড়ি। বাস্তবে সাকিব-তামিম আগে যেখানে ছিলেন, এখনো সেখানেই আছেন এবং সেটা কাল যেখানে ছিলেন সেখানে। বাংলাদেশ দলের ড্রেসিংরুমের সামনে সবুজ গালিচার আড্ডায়। একে অন্যের খুব ভালো সতীর্থ হয়ে বাংলাদেশ দলের খেলোয়াড় তালিকায়। সেখানে বন্ধুত্ব বা পারস্পরিক পছন্দ-অপছন্দের ব্যাপারটা অন্তত তাঁদের কাছে অত গুরুত্বপূর্ণ নয়। মাঠের বোঝাপড়া ঠিক রেখে দলের জন্য ভালো খেলাটাই সব। মাঠের খেলায় সাকিব-তামিমের বোঝাপড়ার রসায়নে তেজস্ক্রিয়তার বুদ্‌বুদ দেখেছেন, এমন দাবি কিন্তু আজ পর্যন্ত কেউই করেননি।

একসময়ে সাকিবের সহ-অধিনায়ক তামিম এখন নিজেই ওয়ানডে দলের অধিনায়ক। তাঁর কোনো সহ-অধিনায়ক আপাতত নেই, কিন্তু মাঠে দরকার পড়লে যে সবার আগে নেতৃত্বে অভিজ্ঞ সাকিবকে ডেকেই পরামর্শ চাইবেন, সেটি তামিমের নেতৃত্বে ২০ জানুয়ারির প্রথম ওয়ানডের আগেই বলে দেওয়া যায়। তামিম বাংলাদেশ দলের ওয়ানডে অধিনায়ক, কিন্তু সাকিব তো ওয়ানডের বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার! তাঁর মতো একজন দলে থাকলে অধিনায়কের রাতের ঘুম এমনিতেই ভালো হবে। সাকিব যখন অধিনায়ক ছিলেন, তামিমের কাছ থেকে দুটো সাহায্য তিনি পেতেন। একটা তো মাঠের পারফরম্যান্স। আরেকটা হলো মাঠের বাইরে দলটাকে বিনি সুতার মালায় গেঁথে রাখা। তামিম বরাবরই এই কাজটা ভালো পারেন। এখন যেহেতু তিনি নিজেই অধিনায়ক, মালা গাঁথা নিশ্চয়ই আরও ভালো হবে। সাকিবের কাছে চাইবেন শুধু মাঠের পারফরম্যান্স, যেটি দিয়ে তিনি একাই পারেন প্রতিপক্ষের সঙ্গে নিজেদের পার্থক্য গড়ে দিতে।

বাংলাদেশের ক্রিকেটটা তাই ঘুরে-ফিরে সেই সাকিব-তামিমের হাতেই।