Dhaka 10:42 pm, Wednesday, 24 April 2024

টিকার নিবন্ধন প্রতিদিন কমছে, বাড়ছে নমুনা পরীক্ষা

  • Reporter Name
  • Update Time : 03:33:30 am, Tuesday, 23 March 2021
  • 190 Time View

সাগর হোসেন : করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে টিকা নিতে মানুষের আগ্রহ আগের চেয়ে কমেছে। টিকার জন্য অনলাইন নিবন্ধনও কম হচ্ছে। একইভাবে টিকাগ্রহীতার দৈনিক সংখ্যাও বেশ কমে এসেছে। যদিও তিন সপ্তাহ ধরে দেশে করোনার সংক্রমণ অনেকটাই বৃদ্ধি পেয়েছে। যে কারণে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার নমুনা পরীক্ষাকেন্দ্রে মানুষের ভিড় বাড়ছে।

দেশে করোনার গণটিকাদান শুরু হয় ৭ ফেব্রুয়ারি। শুরুর দিকে দৈনিক টিকাগ্রহীতার সংখ্যা ২ লাখ ৩০ হাজারের বেশি ছিল। অথচ গতকাল টিকা নিয়েছেন ৭০ হাজার ৯৩৩ জন; যা দেশে করোনার টিকাদান শুরুর প্রথম দিনের পরে সর্বনিম্ন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যত বেশি মানুষকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হবে, সংক্রমণ থেকেও ততো বেশি সুরক্ষা পাওয়া যাবে। নিবন্ধন ও দৈনিক টিকা দেওয়ার গতি বাড়িয়ে অল্প সময়ে বেশি মানুষকে টিকার আওতায় আনা দরকার। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, পরিকল্পনা অনুযায়ীই টিকা দেওয়া হচ্ছে। দিনে সাত থেকে আট লাখ মানুষকে টিকা দেওয়া প্রয়োজন। প্রতিদিন বেশি মানুষকে টিকা দেওয়ার সক্ষমতা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আছে। সেই সক্ষমতা কাজে লাগাতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ এনবি নিউজকে বলেন, টিকা পেতে যাঁরা নিবন্ধন করতে পারবেন (৪০ বছরের বেশি বয়সী), তাঁদের অনেকের ইন্টারনেট ব্যবহারের পর্যাপ্ত সুযোগ নেই। টিকা নিতে মানুষকে উৎসাহিত করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে যেসব উদ্যোগের প্রয়োজন ছিল, তা সেভাবে নেওয়া হয়নি।

নমুনা পরীক্ষাকেন্দ্রে ভিড়
জনস্বাস্থ্যবিদেরা অনেক দিন ধরেই দেশে দৈনিক কমপক্ষে ২০ হাজার নমুনা পরীক্ষা করার কথা বলে আসছেন। দেশে প্রথমবারের মতো ১৬ মার্চ এক দিনে ২০ হাজারের বেশি নমুনা পরীক্ষা হয়েছে। আর গতকাল ২৫ হাজার ১১১টি নমুনা পরীক্ষা হয়েছে; যা দেশে করোনার সংক্রমণ শুরুর পর থেকে এক দিনে সর্বোচ্চ।

অবশ্য এখন দৈনিক যে নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে, তার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বঙ্গবন্ধুর জন্মবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানের আমন্ত্রিত অতিথি ও অংশগ্রহণকারীর। এর বাইরে বিদেশগামী যাত্রীরা রয়েছেন। এ দুই ক্ষেত্রে যাঁদের নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে, তাঁদের মূলত কোনো লক্ষণ-উপসর্গ নেই। তাঁরা আক্রান্ত নন, এটা নিশ্চিত করতেই পরীক্ষা করা হচ্ছে। তাঁদের বাদ দিলে রোগী শনাক্তের হার আরও বাড়বে। গত কয়েক দিন ধরেই শনাক্তের হার ১০ শতাংশের বেশি। দেশে করোনার গণটিকাদান শুরু হয় ৭ ফেব্রুয়ারি। শুরুর দিকে দৈনিক টিকাগ্রহীতার সংখ্যা ২ লাখ ৩০ হাজারের বেশি ছিল। অথচ গতকাল টিকা নিয়েছেন ৭০ হাজার ৯৩৩ জন; যা দেশে করোনার টিকাদান শুরুর প্রথম দিনের পরে সর্বনিম্ন।

গত বছরের মার্চে করোনার সংক্রমণ শনাক্তের শুরু থেকেই নারায়ণগঞ্জ জেলায় করোনা রোগীর সংখ্যা বেশি। এই জেলায় তিনটি নমুনা পরীক্ষাকেন্দ্রের মধ্যে একটি সরকারি আর দুটি বেসরকারি। গত ২৪ ঘণ্টায় সরকারি নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে করোনা পরীক্ষা হয়েছে ৪২০টি। ঠিক এক মাস আগে এই কেন্দ্রে পরীক্ষা হয়েছিল ১৭৫টি নমুনা।

নারায়ণগঞ্জ জেলার করোনা ফোকাল পারসন জাহিদুল ইসলাম এনবি নিউজকে  জানান, কয়েক দিন ধরে করোনা রোগী আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। সেই সঙ্গে নমুনা সংগ্রহের সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

দিনাজপুর এম আবদুর রহিম মেডিকেল কলেজে দৈনিক ১৮৮টি নমুনা পরীক্ষার সক্ষমতা রয়েছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে সেখানে দিনে ৬০-৭০টি নমুনা পরীক্ষা হতো। কলেজের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক যোগেন্দ্রনাথ সরকার এনবি নিউজকে  জানান, এখন গড়ে ১২০টি নমুনা পরীক্ষা হচ্ছে।

কক্সবাজার মেডিকেল কলেজে গত ২৪ ঘণ্টায় নমুনা সংগ্রহ হয়েছে ৬৫০টি। এক মাস আগেও নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা ছিল এর অর্ধেক। কলেজের অধ্যক্ষ অনুপম বড়ুয়া এনবি নিউজকে  বলেন, লাখ লাখ পর্যটক আসায় জেলার সংক্রমণ পরিস্থিতি খারাপ হয়েছে।

রাজধানীর কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে এক মাস আগেও দৈনিক নমুনা পরীক্ষা হতো গড়ে ২০০টি। গত ২৪ ঘণ্টায় এই হাসপাতালে নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ৭০৬টি। রাজধানীর বেসরকারি পরীক্ষাকেন্দ্রগুলোতেও করোনার সংক্রমণ শনাক্তে পরীক্ষার চাপ বেড়েছে।

পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক মোসাদ্দেক হোসেন এনবি নিউজকে  বলেন, মার্চ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের আগে দৈনিক ২০০ থেকে ২৫০টি নমুনা পরীক্ষা হতো। এখন হচ্ছে ৩৫০ থেকে ৪০০টি।

টিকার নিবন্ধন ও গ্রহীতার সংখ্যা কমছে
দেশে গণটিকাদানের শুরুর দিকে মানুষের মধ্যে টিকা নিয়ে বেশ আগ্রহ দেখা যায়। ১৫ থেকে ২২ ফেব্রুয়ারি প্রতিদিন দুই লাখের বেশি মানুষ টিকা নিয়েছেন। এর মধ্যে ১৮ ফেব্রুয়ারি সর্বোচ্চ ২ লাখ ৬১ হাজার ৯৪৫ জন টিকা নিয়েছিলেন। শুরুতে টিকা দেওয়ার যে গতি ছিল, তা ধরে রাখলে বেশি মানুষ টিক পেত, বেশি মানুষ সুরক্ষা পেত। সংক্রমণও কম হতো। এনবি নিউজকে জানালেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পাবলিক হেলথ অ্যাডভাইজারি কমিটির সদস্য আবু জামিল ফয়সাল।

মোট জনসংখ্যার তুলনায় টিকাদানের হার বেশ কম বলে মন্তব্য করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ফার্মাকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান মো. সায়েদুর রহমান। তিনি এনবি নিউজকে  বলেন, ‘দিনে সাত থেকে আট লাখ মানুষকে টিকা দেওয়া প্রয়োজন। প্রতিদিন বেশি মানুষকে টিকা দেওয়ার সক্ষমতা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আছে। সেই সক্ষমতা কাজে লাগাতে হবে।’

বিএসএমএমইউয়ের টিকাদান কেন্দ্রে দৈনিক ১ হাজার ২০০ মানুষকে টিকা দেওয়ার সক্ষমতা আছে। এই কেন্দ্রে কোনো কোনো দিন দেড় হাজারের বেশি মানুষকে টিকা দেওয়া হয়েছে। গতকাল রোববার এই কেন্দ্রে ৮৯ জনকে টিকা দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপপরিচালক (হাসপাতাল শাখা) মো. নাজমুল করিম এনবি নিউজকে  বলেন, ‘এখন টিকার জন্য নিবন্ধন হচ্ছে কম। অন্যদিকে আমাদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া টিকার প্রথম ডোজের পরিমাণও কমে এসেছে।’

দেশে ৪০ বছরের বেশি বয়সী মানুষ এবং সম্মুখসারির কর্মীদের টিকা দিচ্ছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এঁদের মোট সংখ্যা সাড়ে চার কোটির কিছু বেশি। এ পর্যন্ত টিকার জন্য নিবন্ধন করেছেন ৬২ লাখ ৮২ হাজার ৮৮৪ জন। গত রোববার বিকেল পাঁচটা থেকে গতকাল বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় নিবন্ধন করেছেন ৮৪ হাজার ৫০৬ জন। অথচ নিবন্ধনপ্রক্রিয়ার শুরুর দিকে এক দিনে আড়াই লাখের বেশি মানুষ নিবন্ধন করেছিলেন।

তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পাবলিক হেলথ অ্যাডভাইজারি কমিটির সদস্য আবু জামিল ফয়সাল এনবি নিউজকে  বলেন, শুরুতে টিকা দেওয়ার যে গতি ছিল, তা ধরে রাখলে বেশি মানুষ টিক পেত, বেশি মানুষ সুরক্ষা পেত। সংক্রমণও কম হতো।

জাতীয় করোনা টিকা প্রয়োগ পরিকল্পনায় প্রথম পর্যায়ের প্রথম ধাপে দেশের মোট জনসংখ্যার ৩ শতাংশকে টিকা দেওয়ার কথা বলা আছে। এঁদের সংখ্যা ৫১ লাখ ৮৪ হাজার ২৮২ জন। গতকাল পর্যন্ত দেশে মোট ৪৮ লাখ ৪০ হাজার ৯৬৯ জনকে টিকা দেওয়া হয়েছে।

সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির একজন কর্মকর্তা বলছেন, প্রথম পর্যায়ের প্রথম ধাপে প্রথম ডোজ টিকা এ মাসেই শেষ হবে। আগামী ৮ এপ্রিল থেকে প্রথম পর্যায়ের প্রথম ধাপের দ্বিতীয় ডোজ টিকা দেওয়া শুরু হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক নাসিমা সুলতানা এনবি নিউজকে  বলেন, দ্বিতীয় ডোজ টিকা দেওয়ার সময় নতুন নিবন্ধন করা ব্যক্তিদের প্রথম ডোজ টিকাও দেওয়া হবে। অর্থাৎ দ্বিতীয় ও প্রথম ডোজ টিকা একসঙ্গে চলবে। এতে ব্যবস্থাপনার কোনো সমস্যা হবে না।

দেশে ৪০ বছরের বেশি বয়সী মানুষ এবং সম্মুখসারির কর্মীদের টিকা দিচ্ছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এঁদের মোট সংখ্যা সাড়ে চার কোটির কিছু বেশি। এ পর্যন্ত টিকার জন্য নিবন্ধন করেছেন ৬২ লাখ ৮২ হাজার ৮৮৪ জন। গত রোববার বিকেল পাঁচটা থেকে গতকাল বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় নিবন্ধন করেছেন ৮৪ হাজার ৫০৬ জন। অথচ নিবন্ধনপ্রক্রিয়ার শুরুর দিকে এক দিনে আড়াই লাখের বেশি মানুষ নিবন্ধন করেছিলেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি সূত্র বলছে, টিকা দেওয়ার পরিমাণ বাড়বে কি না, তা নির্ভর করছে টিকা প্রাপ্তির ওপর। দেশে এ পর্যন্ত ৯০ লাখ টিকা এসেছে। দুই ডোজ করে এই টিকা ৪৫ লাখ মানুষকে দেওয়া যাবে। ইতিমধ্যে ৪৮ লাখের বেশি মানুষকে প্রথম ডোজ টিকা দেওয়া হয়ে গেছে। সরকারি কর্মকর্তারা আশা করছেন, শিগগিরই টিকা চলে আসবে।

করোনা টিকা সংগ্রহ ও বিতরণের আন্তর্জাতিক উদ্যোগ কোভ্যাক্স থেকে বাংলাদেশে টিকা পাওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু কী পরিমাণ টিকা বাংলাদেশ কবে নাগাদ পাবে, সে ব্যাপারে নিশ্চিত নয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র অধ্যাপক মো. নাজমুল ইসলাম গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘খুব শিগগির পাব এটা বলা যাবে, তবে দিনক্ষণ এই মুহূর্তে বলা সম্ভব নয়।’

টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
বাংলাদেশে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত টিকা ব্যবহার করা হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রতিদিন যে তথ্য গণমাধ্যমে সরবরাহ করে, তাতে বলা হয়েছে, গতকাল পর্যন্ত ৯১৭ জনের মৃদু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

প্রথম ডোজ টিকা নেওয়ার পর বেশ কিছু মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। এমন একজন ব্যক্তি প্রথম আলোর কাছে জানতে চান, দ্বিতীয় ডোজ টিকা তিনি নিতে পারবেন কি না, আর পারলে কোন সময় নেবেন। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক মীরজাদী সেব্রিনা বলেন, আক্রান্ত ব্যক্তি সুস্থ হওয়ার ২৮ দিন পর দ্বিতীয় ডোজ টিকা নেবেন।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

টিকার নিবন্ধন প্রতিদিন কমছে, বাড়ছে নমুনা পরীক্ষা

Update Time : 03:33:30 am, Tuesday, 23 March 2021

সাগর হোসেন : করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে টিকা নিতে মানুষের আগ্রহ আগের চেয়ে কমেছে। টিকার জন্য অনলাইন নিবন্ধনও কম হচ্ছে। একইভাবে টিকাগ্রহীতার দৈনিক সংখ্যাও বেশ কমে এসেছে। যদিও তিন সপ্তাহ ধরে দেশে করোনার সংক্রমণ অনেকটাই বৃদ্ধি পেয়েছে। যে কারণে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার নমুনা পরীক্ষাকেন্দ্রে মানুষের ভিড় বাড়ছে।

দেশে করোনার গণটিকাদান শুরু হয় ৭ ফেব্রুয়ারি। শুরুর দিকে দৈনিক টিকাগ্রহীতার সংখ্যা ২ লাখ ৩০ হাজারের বেশি ছিল। অথচ গতকাল টিকা নিয়েছেন ৭০ হাজার ৯৩৩ জন; যা দেশে করোনার টিকাদান শুরুর প্রথম দিনের পরে সর্বনিম্ন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যত বেশি মানুষকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হবে, সংক্রমণ থেকেও ততো বেশি সুরক্ষা পাওয়া যাবে। নিবন্ধন ও দৈনিক টিকা দেওয়ার গতি বাড়িয়ে অল্প সময়ে বেশি মানুষকে টিকার আওতায় আনা দরকার। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, পরিকল্পনা অনুযায়ীই টিকা দেওয়া হচ্ছে। দিনে সাত থেকে আট লাখ মানুষকে টিকা দেওয়া প্রয়োজন। প্রতিদিন বেশি মানুষকে টিকা দেওয়ার সক্ষমতা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আছে। সেই সক্ষমতা কাজে লাগাতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ এনবি নিউজকে বলেন, টিকা পেতে যাঁরা নিবন্ধন করতে পারবেন (৪০ বছরের বেশি বয়সী), তাঁদের অনেকের ইন্টারনেট ব্যবহারের পর্যাপ্ত সুযোগ নেই। টিকা নিতে মানুষকে উৎসাহিত করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে যেসব উদ্যোগের প্রয়োজন ছিল, তা সেভাবে নেওয়া হয়নি।

নমুনা পরীক্ষাকেন্দ্রে ভিড়
জনস্বাস্থ্যবিদেরা অনেক দিন ধরেই দেশে দৈনিক কমপক্ষে ২০ হাজার নমুনা পরীক্ষা করার কথা বলে আসছেন। দেশে প্রথমবারের মতো ১৬ মার্চ এক দিনে ২০ হাজারের বেশি নমুনা পরীক্ষা হয়েছে। আর গতকাল ২৫ হাজার ১১১টি নমুনা পরীক্ষা হয়েছে; যা দেশে করোনার সংক্রমণ শুরুর পর থেকে এক দিনে সর্বোচ্চ।

অবশ্য এখন দৈনিক যে নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে, তার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বঙ্গবন্ধুর জন্মবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানের আমন্ত্রিত অতিথি ও অংশগ্রহণকারীর। এর বাইরে বিদেশগামী যাত্রীরা রয়েছেন। এ দুই ক্ষেত্রে যাঁদের নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে, তাঁদের মূলত কোনো লক্ষণ-উপসর্গ নেই। তাঁরা আক্রান্ত নন, এটা নিশ্চিত করতেই পরীক্ষা করা হচ্ছে। তাঁদের বাদ দিলে রোগী শনাক্তের হার আরও বাড়বে। গত কয়েক দিন ধরেই শনাক্তের হার ১০ শতাংশের বেশি। দেশে করোনার গণটিকাদান শুরু হয় ৭ ফেব্রুয়ারি। শুরুর দিকে দৈনিক টিকাগ্রহীতার সংখ্যা ২ লাখ ৩০ হাজারের বেশি ছিল। অথচ গতকাল টিকা নিয়েছেন ৭০ হাজার ৯৩৩ জন; যা দেশে করোনার টিকাদান শুরুর প্রথম দিনের পরে সর্বনিম্ন।

গত বছরের মার্চে করোনার সংক্রমণ শনাক্তের শুরু থেকেই নারায়ণগঞ্জ জেলায় করোনা রোগীর সংখ্যা বেশি। এই জেলায় তিনটি নমুনা পরীক্ষাকেন্দ্রের মধ্যে একটি সরকারি আর দুটি বেসরকারি। গত ২৪ ঘণ্টায় সরকারি নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে করোনা পরীক্ষা হয়েছে ৪২০টি। ঠিক এক মাস আগে এই কেন্দ্রে পরীক্ষা হয়েছিল ১৭৫টি নমুনা।

নারায়ণগঞ্জ জেলার করোনা ফোকাল পারসন জাহিদুল ইসলাম এনবি নিউজকে  জানান, কয়েক দিন ধরে করোনা রোগী আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। সেই সঙ্গে নমুনা সংগ্রহের সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

দিনাজপুর এম আবদুর রহিম মেডিকেল কলেজে দৈনিক ১৮৮টি নমুনা পরীক্ষার সক্ষমতা রয়েছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে সেখানে দিনে ৬০-৭০টি নমুনা পরীক্ষা হতো। কলেজের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক যোগেন্দ্রনাথ সরকার এনবি নিউজকে  জানান, এখন গড়ে ১২০টি নমুনা পরীক্ষা হচ্ছে।

কক্সবাজার মেডিকেল কলেজে গত ২৪ ঘণ্টায় নমুনা সংগ্রহ হয়েছে ৬৫০টি। এক মাস আগেও নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা ছিল এর অর্ধেক। কলেজের অধ্যক্ষ অনুপম বড়ুয়া এনবি নিউজকে  বলেন, লাখ লাখ পর্যটক আসায় জেলার সংক্রমণ পরিস্থিতি খারাপ হয়েছে।

রাজধানীর কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে এক মাস আগেও দৈনিক নমুনা পরীক্ষা হতো গড়ে ২০০টি। গত ২৪ ঘণ্টায় এই হাসপাতালে নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ৭০৬টি। রাজধানীর বেসরকারি পরীক্ষাকেন্দ্রগুলোতেও করোনার সংক্রমণ শনাক্তে পরীক্ষার চাপ বেড়েছে।

পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক মোসাদ্দেক হোসেন এনবি নিউজকে  বলেন, মার্চ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের আগে দৈনিক ২০০ থেকে ২৫০টি নমুনা পরীক্ষা হতো। এখন হচ্ছে ৩৫০ থেকে ৪০০টি।

টিকার নিবন্ধন ও গ্রহীতার সংখ্যা কমছে
দেশে গণটিকাদানের শুরুর দিকে মানুষের মধ্যে টিকা নিয়ে বেশ আগ্রহ দেখা যায়। ১৫ থেকে ২২ ফেব্রুয়ারি প্রতিদিন দুই লাখের বেশি মানুষ টিকা নিয়েছেন। এর মধ্যে ১৮ ফেব্রুয়ারি সর্বোচ্চ ২ লাখ ৬১ হাজার ৯৪৫ জন টিকা নিয়েছিলেন। শুরুতে টিকা দেওয়ার যে গতি ছিল, তা ধরে রাখলে বেশি মানুষ টিক পেত, বেশি মানুষ সুরক্ষা পেত। সংক্রমণও কম হতো। এনবি নিউজকে জানালেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পাবলিক হেলথ অ্যাডভাইজারি কমিটির সদস্য আবু জামিল ফয়সাল।

মোট জনসংখ্যার তুলনায় টিকাদানের হার বেশ কম বলে মন্তব্য করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ফার্মাকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান মো. সায়েদুর রহমান। তিনি এনবি নিউজকে  বলেন, ‘দিনে সাত থেকে আট লাখ মানুষকে টিকা দেওয়া প্রয়োজন। প্রতিদিন বেশি মানুষকে টিকা দেওয়ার সক্ষমতা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আছে। সেই সক্ষমতা কাজে লাগাতে হবে।’

বিএসএমএমইউয়ের টিকাদান কেন্দ্রে দৈনিক ১ হাজার ২০০ মানুষকে টিকা দেওয়ার সক্ষমতা আছে। এই কেন্দ্রে কোনো কোনো দিন দেড় হাজারের বেশি মানুষকে টিকা দেওয়া হয়েছে। গতকাল রোববার এই কেন্দ্রে ৮৯ জনকে টিকা দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপপরিচালক (হাসপাতাল শাখা) মো. নাজমুল করিম এনবি নিউজকে  বলেন, ‘এখন টিকার জন্য নিবন্ধন হচ্ছে কম। অন্যদিকে আমাদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া টিকার প্রথম ডোজের পরিমাণও কমে এসেছে।’

দেশে ৪০ বছরের বেশি বয়সী মানুষ এবং সম্মুখসারির কর্মীদের টিকা দিচ্ছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এঁদের মোট সংখ্যা সাড়ে চার কোটির কিছু বেশি। এ পর্যন্ত টিকার জন্য নিবন্ধন করেছেন ৬২ লাখ ৮২ হাজার ৮৮৪ জন। গত রোববার বিকেল পাঁচটা থেকে গতকাল বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় নিবন্ধন করেছেন ৮৪ হাজার ৫০৬ জন। অথচ নিবন্ধনপ্রক্রিয়ার শুরুর দিকে এক দিনে আড়াই লাখের বেশি মানুষ নিবন্ধন করেছিলেন।

তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পাবলিক হেলথ অ্যাডভাইজারি কমিটির সদস্য আবু জামিল ফয়সাল এনবি নিউজকে  বলেন, শুরুতে টিকা দেওয়ার যে গতি ছিল, তা ধরে রাখলে বেশি মানুষ টিক পেত, বেশি মানুষ সুরক্ষা পেত। সংক্রমণও কম হতো।

জাতীয় করোনা টিকা প্রয়োগ পরিকল্পনায় প্রথম পর্যায়ের প্রথম ধাপে দেশের মোট জনসংখ্যার ৩ শতাংশকে টিকা দেওয়ার কথা বলা আছে। এঁদের সংখ্যা ৫১ লাখ ৮৪ হাজার ২৮২ জন। গতকাল পর্যন্ত দেশে মোট ৪৮ লাখ ৪০ হাজার ৯৬৯ জনকে টিকা দেওয়া হয়েছে।

সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির একজন কর্মকর্তা বলছেন, প্রথম পর্যায়ের প্রথম ধাপে প্রথম ডোজ টিকা এ মাসেই শেষ হবে। আগামী ৮ এপ্রিল থেকে প্রথম পর্যায়ের প্রথম ধাপের দ্বিতীয় ডোজ টিকা দেওয়া শুরু হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক নাসিমা সুলতানা এনবি নিউজকে  বলেন, দ্বিতীয় ডোজ টিকা দেওয়ার সময় নতুন নিবন্ধন করা ব্যক্তিদের প্রথম ডোজ টিকাও দেওয়া হবে। অর্থাৎ দ্বিতীয় ও প্রথম ডোজ টিকা একসঙ্গে চলবে। এতে ব্যবস্থাপনার কোনো সমস্যা হবে না।

দেশে ৪০ বছরের বেশি বয়সী মানুষ এবং সম্মুখসারির কর্মীদের টিকা দিচ্ছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এঁদের মোট সংখ্যা সাড়ে চার কোটির কিছু বেশি। এ পর্যন্ত টিকার জন্য নিবন্ধন করেছেন ৬২ লাখ ৮২ হাজার ৮৮৪ জন। গত রোববার বিকেল পাঁচটা থেকে গতকাল বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় নিবন্ধন করেছেন ৮৪ হাজার ৫০৬ জন। অথচ নিবন্ধনপ্রক্রিয়ার শুরুর দিকে এক দিনে আড়াই লাখের বেশি মানুষ নিবন্ধন করেছিলেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি সূত্র বলছে, টিকা দেওয়ার পরিমাণ বাড়বে কি না, তা নির্ভর করছে টিকা প্রাপ্তির ওপর। দেশে এ পর্যন্ত ৯০ লাখ টিকা এসেছে। দুই ডোজ করে এই টিকা ৪৫ লাখ মানুষকে দেওয়া যাবে। ইতিমধ্যে ৪৮ লাখের বেশি মানুষকে প্রথম ডোজ টিকা দেওয়া হয়ে গেছে। সরকারি কর্মকর্তারা আশা করছেন, শিগগিরই টিকা চলে আসবে।

করোনা টিকা সংগ্রহ ও বিতরণের আন্তর্জাতিক উদ্যোগ কোভ্যাক্স থেকে বাংলাদেশে টিকা পাওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু কী পরিমাণ টিকা বাংলাদেশ কবে নাগাদ পাবে, সে ব্যাপারে নিশ্চিত নয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র অধ্যাপক মো. নাজমুল ইসলাম গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘খুব শিগগির পাব এটা বলা যাবে, তবে দিনক্ষণ এই মুহূর্তে বলা সম্ভব নয়।’

টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
বাংলাদেশে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত টিকা ব্যবহার করা হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রতিদিন যে তথ্য গণমাধ্যমে সরবরাহ করে, তাতে বলা হয়েছে, গতকাল পর্যন্ত ৯১৭ জনের মৃদু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

প্রথম ডোজ টিকা নেওয়ার পর বেশ কিছু মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। এমন একজন ব্যক্তি প্রথম আলোর কাছে জানতে চান, দ্বিতীয় ডোজ টিকা তিনি নিতে পারবেন কি না, আর পারলে কোন সময় নেবেন। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক মীরজাদী সেব্রিনা বলেন, আক্রান্ত ব্যক্তি সুস্থ হওয়ার ২৮ দিন পর দ্বিতীয় ডোজ টিকা নেবেন।