Dhaka 6:03 pm, Monday, 22 April 2024

আলোর বণ্যায় পাল্টে যাচ্ছে জীবন

  • Reporter Name
  • Update Time : 04:47:55 am, Wednesday, 20 January 2021
  • 344 Time View

 

সারওয়ার খান : দক্ষিণের অজপাড়াগাঁয়ের একটি গ্রাম কমলাপুর। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার, চিকিৎসা ব্যবস্থা এসবের কিছুই নেই কাছে-পিঠে। সদাইপাতির জন্য দুই গ্রাম পেরিয়ে সপ্তাহে একদিন বসা হাটই ভরসা। আর পড়াশুনার জন্য ভরসা ছয় কিলোমিটার দূরের প্রাইমারি স্কুল। চিকিৎসার জন্য জেলা শহর পটুয়াখালীর বিকল্প নেই। এছাড়া এখানকার রাস্তাঘাটও খুব কম। যেখানে বর্ষায় যাতায়াতের মাধ্যম শুধু নৌকা। এমন এক গ্রামের মানুষ জীবনে প্রথমবারের মতো বিদ্যুতের আলো দেখছে। মাত্র বছর খানেক আগে সেখানে বিদ্যুতের আলো পৌঁছেছে। আর এই এক বছরেই পাল্টে গেছে সেখানকার চিত্র। এখন ঘরে ঘরে টেলিভিশন, বৈদ্যুতিক পাখা, বিদ্যুৎচালিত কৃষি যন্ত্রপাতি থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় সবকিছুই রয়েছে সেখানে।

বিদ্যুৎ যে একটা গ্রামের চিত্র রাতারাতি বদলে দিতে পারে তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ পটুয়াখালীর গ্রাম কমলাপুর। সেখানকার মানুষের প্রধান পেশা কৃষি। অন্য উপজেলার আত্মীয় বাড়ি থেকে এসএসসি পাশ করলেও নানা কারণে পড়াশুনা এগিয়ে নিতে পারেনি কমলাপুরের সুমন চন্দ্র রায় (৩৩)। তিনি বর্তমানে যুক্ত পৈত্রিক পেশা কৃষিতে। এক সময় তার দিন এনে দিনে খাওয়ার মতো অবস্থা ছিল। বিদ্যুৎ আসার পর সুমন বিদ্যুৎচালিত কৃষি যন্ত্রপাতি কিনেছেন। তা দিয়ে দ্রুত কৃষিকাজ করতে পারেন।

মোবাইল ফোনে কথা হয় সুমনের সঙ্গে। তিনি জানান, কৃষি যন্ত্রপাতি অন্যদের ভাড়া দিয়েও ভালো আয় হয়। এখন কৃষিকাজের পাশাপাশি ছোট্ট একটা মুদি দোকান চালান তিনি। সেখানে বিকাশ ও ফ্লেক্সিলোডের ব্যবসাও করেন। নিজের উৎপাদিত পণ্য স্মার্টফোনের মাধ্যমে পাইকারদের কাছে তুলে করেন। এখন আর পণ্য নিয়ে শহরে গিয়ে বসে থাকতে হয় না। পাইকারি ব্যবসায়ীরা ছবি দেখে পণ্য পছন্দ করে অর্ডার করেন। সুমনের পরিবারের আয় বেড়েছে। তার মতো অন্য পরিবারগুলোরও অর্থনৈতিক চেহারা পাল্টাতে শুরু করেছে।

পটুয়াখালীর আরেক গ্রাম চর নাজির। কলাপাড়া উপজেলার বালিয়াডালি ইউনিয়নের কামরুলের (২৭)ভাগ্যও বদলে দিয়েছে বিদ্যুৎ। ২০১৮ সালে বিদ্যুৎ সংযোগ পেয়ে ব্যাটারিচালিত ভ্যান কিনে অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা ফিরেছে পরিবারে। বিদ্যুতের আলো পৌঁছে গেছে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলেও। তাই জীবন বদলানোর সত্য ঘটনাগুলো এখন শুধু সুমন, কামরুলদের নয় বাউফল উপজেলার চৈতালি গ্রামের সুবল কুলু (৪০), বাঁশবাড়িয়ার পরশদের (৩৫)। বিদ্যুৎ তাদের জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য এনে দিয়েছে।

দেশের এমন প্রত্যন্ত অঞ্চলের কিছু গ্রামের বাসিন্দাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা গেছে, এসব অঞ্চলে বিদ্যুৎ পৌঁছানোর পর যানবাহন সুবিধা বেড়েছে। যে হাট-বাজার সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে উঠে যেত এখন তা মধ্যরাত পর্যন্ত খোলা থাকছে। কৃষিতে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহারে কম সময়ে চাষাবাদের সুযোগ ও সেচে বিদ্যুতের ব্যবহার বেড়েছে। হাঁস মুরগিসহ বিভিন্ন খামার ও মাছ চাষ বেড়েছে। কৃষিতে নতুন নতুন ফসল যুক্ত হচ্ছে। কারণ, নতুন ফসল শহরে বিক্রি করা মুশকিল ছিল। এখন স্মার্টফোনের কারণে সেসব পণ্য বিক্রি সহজ হয়েছে। আগে দেশের যেকোনো ধরনের সংবাদ এসব প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছাতো না। এখন তারা টেলিভিশনে দেখতে ও জানতে পারছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাবে, দেশের ৯৯ শতাংশ এলাকায় বিদ্যুৎ পৌঁছে গেছে। কিছুদিনের মধ্যেই শতভাগ এলাকা বিদ্যুতের আওতায় আসার ঘোষণা আসবে। দেশে এখন বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২৪ হাজার মেগাওয়াট। বর্তমানে দৈনিক উৎপাদন দিনে সর্বোচ্চ ১২ হাজার ২৪৫ মেগাওয়াট আর সন্ধ্যায় ১৩ হাজার ৬২১ মেগাওয়াট। অতীতের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যাবে এই সময়ে ২০০৯ সালে দৈনিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিলো ৩ হাজার ২৬৮ মেগাওয়াট। গত ১১ বছরে বিদ্যুৎ উৎপাদন যেমন বেড়েছে তেমনি গ্রাহক সংখ্যাও তিনগুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে গ্রাহক সংখ্যা ৩ কোটি ৮২ লাখ।

সম্প্রতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ তার ভেরিফাইড ফেসবুক পেইজে রাজশাহী ও লালমনিরহাটের দুর্গম এলাকার কিছু ছবি পোস্ট করে লিখেছেন, ‘ছবিগুলো দুর্গম চরাঞ্চলের মানুষের বিদ্যুতায়নের। নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড (নেসকো) রাজশাহী এবং লালমনিরহাটের বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলের প্রায় ১০ হাজারের বেশি পরিবারের মাঝে নিজস্ব অর্থায়নে সোলার প্যানেল দিয়ে বিদ্যুতায়ন করছে। মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এইসব চরাঞ্চলের মানুষেরাও হয়তো কখনও ভাবেননি তাদের ঘরে বিদ্যুতের আলো পৌঁছাবে।’

তিনি বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ডিসেম্বরের মধ্যেই দেশের সকল গ্রিড এলাকায় শতভাগ বিদ্যুতায়ন শেষ হয়েছে। মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন বা দুর্গম এলাকায় যেখানে গ্রিডলাইন নেই সেইসব ঘরেও মুজিববর্ষের মধ্যেই পৌঁছে যাবে বিদ্যুতের আলো। ‘শেখ হাসিনার উদ্যোগ ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ’- এই মূল মন্ত্রকে ধারণ করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষের মধ্যেই শতভাগ বিদ্যুতায়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছি আমরা। বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে আমাদের অনেক কাজে বিঘ্ন ঘটেছে। কিন্তু আমাদের লক্ষ্য থেকে একচুলও নড়াতে পারেনি। আমরা ইতিহাসের এক মাহেন্দ্রক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী এবং প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের সুবর্ণ জয়ন্তীতে এদেশের শতভাগ মানুষের ঘর বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠেছে।’

বিদ্যুৎ বিভাগ সুত্রে জানা গেছে, ‘গ্রিডের আওতায় দেশের সকল উপজেলা এখন শতভাগ বিদ্যুতায়নের আওতায়। তবে দেশের প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকায় এখনও এক হাজার ৫৯টি গ্রাম বিদ্যুতের আওতার বাইরে রয়েছে। এসব গ্রাম পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) এলাকার। দেশের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ বিতরণ প্রতিষ্ঠান আরইবি সূত্র জানায়, তাদের আওতাধীন প্রায় আড়াই লাখ গ্রাহক রয়েছেন যাদের কাছে এখনও বিদ্যুৎ পৌঁছাতে পারেননি। অফগ্রিডে থাকা সেসব স্থানে সাবমেরিন কেবল ব্যবহার করে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার কাজ চলছে। পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলা প্রায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চল। সেখানে সাবমেরিন কেবল দিয়ে নদী অতিক্রম করে বিদ্যুৎসংযোগ দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, লক্ষ্মীপুর, গাইবান্ধা, রংপুর, পটুয়াখালী ও ভোলা জেলার ২৯টি গ্রামের প্রায় ৬ হাজার বাড়িতে সৌর বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে।

আরইবি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মঈন উদ্দিন এনবি নিউজকে বলেন, মুজিবর্ষেই বাকি সব প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া হবে। মানুষ এরই মধ্যে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার সুফল ভোগ করছে। বিদ্যুৎ পৌঁছে দিলে জনজীবনে আরও পরিবর্তন আসবে।

গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ পৌঁছে যাওয়ায় কৃষকরা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয়েছেন। তারা এখন সেচকাজে ডিজেলের পরিবর্তে বিদ্যুৎ ব্যবহার করছেন। এক সূত্রে জানা গেছে, সেচ পাম্পের সংখ্যা ২ লাখ ৩৪ হাজার থেকে ৩ লাখ ৬২ হাজারে উন্নীত হয়েছে। এলাকাভিত্তিক ছোট ছোট কারখানা গড়ে উঠেছে। যারা নিজেদের মধ্যেই কেনাবেচা করা এবং অন্য শহরেও বিক্রির সুযোগ হয়েছে। ব্যবসায় পরিবর্তন এসেছে। প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে।’

এদিকে মুজিববর্ষে দেশে শতভাগ বিদ্যুতায়নের লক্ষ্য ছাড়াও আরও একগুচ্ছ কর্ম পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে কাজ করছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এর মধ্যে রয়েছে চলতি বছরের মধ্যেই বিদ্যুতের উৎপাদন ক্ষমতা ২৪ হাজার মেগাওয়াটে এবং ২০৩০ সালে ৪০ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করা; এ বছরেই ছয়হাজার কিলোমিটার সঞ্চালনলাইন এবং এক লাখ কিলোমিটার বিতরণ লাইন ও প্রয়োজনীয় উপকেন্দ্র নির্মাণ। পরিকল্পনায় আরও রয়েছে- বিদ্যুত উৎপাদনে প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত, বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট ও চলতি বছরেই প্রকল্প বাস্তবায়ন করে ২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সংস্থান করা। এছাড়াও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, আঞ্চলিক গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ আমদানিতে সিস্টেম লস কমানোসহ আরও পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে বিদ্যুৎ বিভাগ।

উল্লেখ্য, বিদ্যুৎখাত দেখভাল করার জন্য বিদ্যুৎ বিভাগের ছয়টি সঞ্চালন এবং পাঁচটি বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। পাশাপাশি পাওয়ার সেল বিদ্যুৎ বিভাগের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসাবে কাজ করে।

সাখা/২০ জানুয়ারি/২০২১

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আলোর বণ্যায় পাল্টে যাচ্ছে জীবন

Update Time : 04:47:55 am, Wednesday, 20 January 2021

 

সারওয়ার খান : দক্ষিণের অজপাড়াগাঁয়ের একটি গ্রাম কমলাপুর। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার, চিকিৎসা ব্যবস্থা এসবের কিছুই নেই কাছে-পিঠে। সদাইপাতির জন্য দুই গ্রাম পেরিয়ে সপ্তাহে একদিন বসা হাটই ভরসা। আর পড়াশুনার জন্য ভরসা ছয় কিলোমিটার দূরের প্রাইমারি স্কুল। চিকিৎসার জন্য জেলা শহর পটুয়াখালীর বিকল্প নেই। এছাড়া এখানকার রাস্তাঘাটও খুব কম। যেখানে বর্ষায় যাতায়াতের মাধ্যম শুধু নৌকা। এমন এক গ্রামের মানুষ জীবনে প্রথমবারের মতো বিদ্যুতের আলো দেখছে। মাত্র বছর খানেক আগে সেখানে বিদ্যুতের আলো পৌঁছেছে। আর এই এক বছরেই পাল্টে গেছে সেখানকার চিত্র। এখন ঘরে ঘরে টেলিভিশন, বৈদ্যুতিক পাখা, বিদ্যুৎচালিত কৃষি যন্ত্রপাতি থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় সবকিছুই রয়েছে সেখানে।

বিদ্যুৎ যে একটা গ্রামের চিত্র রাতারাতি বদলে দিতে পারে তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ পটুয়াখালীর গ্রাম কমলাপুর। সেখানকার মানুষের প্রধান পেশা কৃষি। অন্য উপজেলার আত্মীয় বাড়ি থেকে এসএসসি পাশ করলেও নানা কারণে পড়াশুনা এগিয়ে নিতে পারেনি কমলাপুরের সুমন চন্দ্র রায় (৩৩)। তিনি বর্তমানে যুক্ত পৈত্রিক পেশা কৃষিতে। এক সময় তার দিন এনে দিনে খাওয়ার মতো অবস্থা ছিল। বিদ্যুৎ আসার পর সুমন বিদ্যুৎচালিত কৃষি যন্ত্রপাতি কিনেছেন। তা দিয়ে দ্রুত কৃষিকাজ করতে পারেন।

মোবাইল ফোনে কথা হয় সুমনের সঙ্গে। তিনি জানান, কৃষি যন্ত্রপাতি অন্যদের ভাড়া দিয়েও ভালো আয় হয়। এখন কৃষিকাজের পাশাপাশি ছোট্ট একটা মুদি দোকান চালান তিনি। সেখানে বিকাশ ও ফ্লেক্সিলোডের ব্যবসাও করেন। নিজের উৎপাদিত পণ্য স্মার্টফোনের মাধ্যমে পাইকারদের কাছে তুলে করেন। এখন আর পণ্য নিয়ে শহরে গিয়ে বসে থাকতে হয় না। পাইকারি ব্যবসায়ীরা ছবি দেখে পণ্য পছন্দ করে অর্ডার করেন। সুমনের পরিবারের আয় বেড়েছে। তার মতো অন্য পরিবারগুলোরও অর্থনৈতিক চেহারা পাল্টাতে শুরু করেছে।

পটুয়াখালীর আরেক গ্রাম চর নাজির। কলাপাড়া উপজেলার বালিয়াডালি ইউনিয়নের কামরুলের (২৭)ভাগ্যও বদলে দিয়েছে বিদ্যুৎ। ২০১৮ সালে বিদ্যুৎ সংযোগ পেয়ে ব্যাটারিচালিত ভ্যান কিনে অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা ফিরেছে পরিবারে। বিদ্যুতের আলো পৌঁছে গেছে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলেও। তাই জীবন বদলানোর সত্য ঘটনাগুলো এখন শুধু সুমন, কামরুলদের নয় বাউফল উপজেলার চৈতালি গ্রামের সুবল কুলু (৪০), বাঁশবাড়িয়ার পরশদের (৩৫)। বিদ্যুৎ তাদের জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য এনে দিয়েছে।

দেশের এমন প্রত্যন্ত অঞ্চলের কিছু গ্রামের বাসিন্দাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা গেছে, এসব অঞ্চলে বিদ্যুৎ পৌঁছানোর পর যানবাহন সুবিধা বেড়েছে। যে হাট-বাজার সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে উঠে যেত এখন তা মধ্যরাত পর্যন্ত খোলা থাকছে। কৃষিতে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহারে কম সময়ে চাষাবাদের সুযোগ ও সেচে বিদ্যুতের ব্যবহার বেড়েছে। হাঁস মুরগিসহ বিভিন্ন খামার ও মাছ চাষ বেড়েছে। কৃষিতে নতুন নতুন ফসল যুক্ত হচ্ছে। কারণ, নতুন ফসল শহরে বিক্রি করা মুশকিল ছিল। এখন স্মার্টফোনের কারণে সেসব পণ্য বিক্রি সহজ হয়েছে। আগে দেশের যেকোনো ধরনের সংবাদ এসব প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছাতো না। এখন তারা টেলিভিশনে দেখতে ও জানতে পারছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাবে, দেশের ৯৯ শতাংশ এলাকায় বিদ্যুৎ পৌঁছে গেছে। কিছুদিনের মধ্যেই শতভাগ এলাকা বিদ্যুতের আওতায় আসার ঘোষণা আসবে। দেশে এখন বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২৪ হাজার মেগাওয়াট। বর্তমানে দৈনিক উৎপাদন দিনে সর্বোচ্চ ১২ হাজার ২৪৫ মেগাওয়াট আর সন্ধ্যায় ১৩ হাজার ৬২১ মেগাওয়াট। অতীতের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যাবে এই সময়ে ২০০৯ সালে দৈনিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিলো ৩ হাজার ২৬৮ মেগাওয়াট। গত ১১ বছরে বিদ্যুৎ উৎপাদন যেমন বেড়েছে তেমনি গ্রাহক সংখ্যাও তিনগুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে গ্রাহক সংখ্যা ৩ কোটি ৮২ লাখ।

সম্প্রতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ তার ভেরিফাইড ফেসবুক পেইজে রাজশাহী ও লালমনিরহাটের দুর্গম এলাকার কিছু ছবি পোস্ট করে লিখেছেন, ‘ছবিগুলো দুর্গম চরাঞ্চলের মানুষের বিদ্যুতায়নের। নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড (নেসকো) রাজশাহী এবং লালমনিরহাটের বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলের প্রায় ১০ হাজারের বেশি পরিবারের মাঝে নিজস্ব অর্থায়নে সোলার প্যানেল দিয়ে বিদ্যুতায়ন করছে। মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এইসব চরাঞ্চলের মানুষেরাও হয়তো কখনও ভাবেননি তাদের ঘরে বিদ্যুতের আলো পৌঁছাবে।’

তিনি বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ডিসেম্বরের মধ্যেই দেশের সকল গ্রিড এলাকায় শতভাগ বিদ্যুতায়ন শেষ হয়েছে। মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন বা দুর্গম এলাকায় যেখানে গ্রিডলাইন নেই সেইসব ঘরেও মুজিববর্ষের মধ্যেই পৌঁছে যাবে বিদ্যুতের আলো। ‘শেখ হাসিনার উদ্যোগ ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ’- এই মূল মন্ত্রকে ধারণ করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষের মধ্যেই শতভাগ বিদ্যুতায়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছি আমরা। বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে আমাদের অনেক কাজে বিঘ্ন ঘটেছে। কিন্তু আমাদের লক্ষ্য থেকে একচুলও নড়াতে পারেনি। আমরা ইতিহাসের এক মাহেন্দ্রক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী এবং প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের সুবর্ণ জয়ন্তীতে এদেশের শতভাগ মানুষের ঘর বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠেছে।’

বিদ্যুৎ বিভাগ সুত্রে জানা গেছে, ‘গ্রিডের আওতায় দেশের সকল উপজেলা এখন শতভাগ বিদ্যুতায়নের আওতায়। তবে দেশের প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকায় এখনও এক হাজার ৫৯টি গ্রাম বিদ্যুতের আওতার বাইরে রয়েছে। এসব গ্রাম পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) এলাকার। দেশের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ বিতরণ প্রতিষ্ঠান আরইবি সূত্র জানায়, তাদের আওতাধীন প্রায় আড়াই লাখ গ্রাহক রয়েছেন যাদের কাছে এখনও বিদ্যুৎ পৌঁছাতে পারেননি। অফগ্রিডে থাকা সেসব স্থানে সাবমেরিন কেবল ব্যবহার করে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার কাজ চলছে। পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলা প্রায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চল। সেখানে সাবমেরিন কেবল দিয়ে নদী অতিক্রম করে বিদ্যুৎসংযোগ দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, লক্ষ্মীপুর, গাইবান্ধা, রংপুর, পটুয়াখালী ও ভোলা জেলার ২৯টি গ্রামের প্রায় ৬ হাজার বাড়িতে সৌর বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে।

আরইবি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মঈন উদ্দিন এনবি নিউজকে বলেন, মুজিবর্ষেই বাকি সব প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া হবে। মানুষ এরই মধ্যে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার সুফল ভোগ করছে। বিদ্যুৎ পৌঁছে দিলে জনজীবনে আরও পরিবর্তন আসবে।

গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ পৌঁছে যাওয়ায় কৃষকরা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয়েছেন। তারা এখন সেচকাজে ডিজেলের পরিবর্তে বিদ্যুৎ ব্যবহার করছেন। এক সূত্রে জানা গেছে, সেচ পাম্পের সংখ্যা ২ লাখ ৩৪ হাজার থেকে ৩ লাখ ৬২ হাজারে উন্নীত হয়েছে। এলাকাভিত্তিক ছোট ছোট কারখানা গড়ে উঠেছে। যারা নিজেদের মধ্যেই কেনাবেচা করা এবং অন্য শহরেও বিক্রির সুযোগ হয়েছে। ব্যবসায় পরিবর্তন এসেছে। প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে।’

এদিকে মুজিববর্ষে দেশে শতভাগ বিদ্যুতায়নের লক্ষ্য ছাড়াও আরও একগুচ্ছ কর্ম পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে কাজ করছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এর মধ্যে রয়েছে চলতি বছরের মধ্যেই বিদ্যুতের উৎপাদন ক্ষমতা ২৪ হাজার মেগাওয়াটে এবং ২০৩০ সালে ৪০ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করা; এ বছরেই ছয়হাজার কিলোমিটার সঞ্চালনলাইন এবং এক লাখ কিলোমিটার বিতরণ লাইন ও প্রয়োজনীয় উপকেন্দ্র নির্মাণ। পরিকল্পনায় আরও রয়েছে- বিদ্যুত উৎপাদনে প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত, বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট ও চলতি বছরেই প্রকল্প বাস্তবায়ন করে ২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সংস্থান করা। এছাড়াও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, আঞ্চলিক গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ আমদানিতে সিস্টেম লস কমানোসহ আরও পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে বিদ্যুৎ বিভাগ।

উল্লেখ্য, বিদ্যুৎখাত দেখভাল করার জন্য বিদ্যুৎ বিভাগের ছয়টি সঞ্চালন এবং পাঁচটি বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। পাশাপাশি পাওয়ার সেল বিদ্যুৎ বিভাগের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসাবে কাজ করে।

সাখা/২০ জানুয়ারি/২০২১